৭৮ এ সোনালি কাবিনের নায়ক

 আবু সাঈদ হাননান
১১ জুলাই কবি আল মাহমুদের জন্মদিন। এই শালপ্রাংশু ব্যক্তি বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে ও প্রায় প্রত্যেক সৃষ্টিশীল কন্দরে অত্যুজ্জ্বোল ছাপ রেখেছেন স্বীয় প্রতিভায়। ছয় দশক জুড়ে তাঁর সৃষ্টিশীল প্রয়াসে সমৃদ্ব হয়েছে আমাদের ভাষা ও সাহিত্য। সৃষ্টির প্রাণপ্রাচুর্যে স্বদেশ, স্বকীয়তায় হৃদয়ের গহীন অনুভবের বর্ণনায় এমন সচল ও একক হতে কারো ছায়া অনুভুত হয়না আল মাহমুদের মত। তাঁর অলোকসামান্য সৃজন প্রবাহে ঋদ্ধ হয়েছে বাংলা সাহিত্যের শিরা উপশিরা।
বাংলা ভেজা মাটির গন্ধ আর সোঁদা মেটেল আবহ তার কবিতা ও গদ্যের অন্যতম অনুষঙ্গ। বাংলদেশের জলজ মাটির গন্ধ গায়ে মেখে আল মাহমুদ লিখে গেছেন মানবিকতার জয়কথা।

“ দ্যাখো জয়নুলের ছবির মত ঘরবাড়ি,নারী
উঠোনে ঝাড়ছে ধান, ধানের ধুলোয় ম্লান শাড়ী ;
গতর উদোম করে হাতে লেঙ্গা মাটির চত্বরে
লাঞ্চিত নিশেন হয়ে পড়ে আছে অনাদরে”
(প্রত্যাবর্তন: কালের কলস )

আল মাহমুদের এই চিত্রকল্পে পুরো বাংলাদেশ বাঙময় , এখানে জয়নুলের ছবি, উঠোনে ধান, ধানের ধুলোয় ম্লান শাড়ি, হাতে লেখা মাটির চত্বর সবই বাংলার নদী আর ধানের মতই বাস্তব । এখানে বাস্তবের বাস্তুভিটার অনাদর আর লাঞ্চনার ইতিহাসও উজ্জল।

আল মাহমুদের অনুভবের বিভা শতরঙ্গা। লোকজ অনুভবের নিবিড়তা তাঁর কাব্যসমুহের অর্থমাত্রায় ব্যঞ্জনার নানামাত্রিক গভীরতা দান করেছে। তার কাব্যিক অবিজ্ঞান অভ্রংলেহী। তাঁর চিত্তসন্নত , ভাবনা সুউন্নত এবং সম্ভ্রম জাগানিয়া । তাঁর প্রতিটি কাব্যগ্রন্থ সৃষ্টি-সুষমায়-ভাবনায় লাবন্যে ,ছন্দ-সৌন্দর্যে ঈর্ষণীয় ।

আল মাহমুদের সমসাময়িক যাঁরা তাঁর বিরূদ্ধে অবস্থান করেন তারা মূলত রাজনৈতিক হিংসাকে লালন করেন । শুধুমাত্র রাজনীতির ক্ষুদ্র মানসিকতার দরূন একজন কবির অবদানকে খন্ডিত কিংবা ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা নি:সন্দেহে রাজনৈতিক আচরণ।

একথাও স্বীকার্য যে- রক্তে মাংসের আল মাহমুদ ক্ষুধা,কাম,লোভ,হিংসা আর রাজনৈতিক আদর্শ লালনে কাতর একজন মানুষ । তারপরেও এ ময়ুখ কবির দেবদারুর মত সুকঠিন ভিত আর সুউচ্চ প্রতিভা মানবীয় সকল চাওয়া পাওয়ার সংকীর্ণতাকে মুছে দেয় আপন মহিমায়।

আল মাহমুদকে যারা এডিয়ে যাবার চেষ্টা করেন, তাদের একটি বিষয় জানা থাকা দরকার- বুদ্ধদেব বসু তাঁর কবিতা পত্রিকায় প্রথমবার আল মাহমুদের একটি কবিতা ছাপালেন, এরপর বুদ্ধদেবের কাছে আসতে থাকে বক্র আর ঋজু বানের লেখা হরেক রকম চিঠি । বুদ্ধদেব তার পরবর্তী সংখ্যা কবিতা পত্রিকা শুধুমাত্র আল মাহমুদের কবিতা দিয়ে প্রকাশ করলেন । নিন্দুকের মুখে ছাই দিয়ে আল মাহমুদ জানান দিলেন তার মহাকবি হওয়ার অমিত সম্ভাবনা, আল মাহমুদ এ রকম চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে এসেছেন বহু বাঁকে । কবি চট্রগ্রামে থাকা অবস্থায় একবার চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে এলেন। দাওয়াতটি পেয়েছিলেন প্রফেসর সৈয়দ আলী আহসানের মাধ্যমে । অনুষ্ঠানে কবির জন্য রক্ষিত চেয়ারটি দখল করে বসে রইলেন বাংলা সাহিত্যের এক অধ্যাপক। অধ্যাপকের দম্ভ হল কোথাকার কোন আল মাহমুদ, আন্ডার মেট্টিক, তার জন্য আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের পাশের চেয়ার ? বেছারা আল মাহমুদ নিরুপায় হয়ে অন্য একটি চেয়ারে বসলেন ।

কিন্তু বক্তৃতাপর্বে আল মাহমুদ যে বক্তৃতা রাখলেন  তাতে ঐ অধ্যাপক লাজ্জিত হয়ে আল মাহমুদের কাছে ক্ষমা চাইলেন ।

আল মাহমুদের সোনালী কাবিন সত্যিকার অর্থে বাংলা সাহিত্যের  অমুল্য সম্পদ। সোনালী কাবিনের সনেটগুলো অতীত মহিমায় গঠিত, বর্তমান ক্রুদ্ধ ও ভবিষ্যতের সংকল্পে উদ্দীপ্ত। এ প্রসঙ্গে জ্ঞান তাপস প্রফেসর সৈয়দ আলী আহসান বলেছেন সোনালী কাবিনের কবিতা হচ্ছে  কবি উপমা রুপকের অভিচর্চার যে নিদর্শন রেখেছেন আমাদের কবিতার ক্ষেত্রে তা নতুন এবং আন্তরিক সততায় উজ্জল।

আল মাহমুদ মুলত মাথার চুল পেকে পায়ের নখ পর্যন্ত নির্মেদ কবি

আল মাহমুদের কবিতা ত্রিকাল বিহারী । অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যত-এক কথায় লোক-লোকান্তর কবির কাব্যে উম্মোখ হয়েছে। যে কারণে দশটি কাব্য গ্রন্থের বিচ্ছিন্ন আলোচনায় ও তাঁর কবিতার বিজয়ের গান ধ্বনিত । বিজ্ঞ পাঠকের মন্তব্য; “কলিকাতার কাব্য পাঠকেরা কিন্তু এখানো আপনাকেই বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে স্বীকার করে। কবিতা লেখার ব্যাপারে আপনা সহৃদয় আলস্য । আরো কবিতা লিখুন । না লিখলে আমরা এতিম। ( দাউদ হাইদার ২৯-০৪-৮৩ কলকাতা থেকে )। সোনালী কাবিন সম্পর্কে অধ্যাপক অমিতাভ চৌধুরী বলেন – আমি আল মাহমুদের সোনালী কাবিনটা বারবার পড়ি । (প্রাক্তন অধ্যাপক বিশ্ব ভারতী ) । “আল মাহমুদের সোনালী কাবিনটা খুব বিশিষ্ট বই বলে মনে করি । উভয় বঙ্গের কাব্যকীতির্, সব কবিদের কাব্যকীর্তি পরীক্ষা করলে আল মাহমুদকে একজন শ্রেষ্ঠকবি আখ্যা দিতে হয়।” (সৈয়দ আলী আহসান ) । বাংলাদেশের অসংখ্য পাঠক আল মাহমুদের কবিতা পড়ে তৃপ্তহন এবং আল মাহমুদ জনপ্রিয়তার জন্য কিছুমাত্র চিন্তিত না হয়েও জনপ্রিয় হয়েছেন (ড: আনিসুজ্জামান ) । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেরাত্তর কবিতার দ্রাঘিমা সনাক্ত করতে হলে যে সকল বিরল গ্রন্থেও কাছে বারবার ফিরে যেতে হবে লোক লোকান্তর তার অন্যতম (শহীদ কাদরী)। “তিরিশি কবিদেও মধ্যে শ্রেষ্ঠ তথা আধুনিক বাংলা কবিতার জনকপরুষ কবি জীবনানন্দ দাশের পরে মৌলিকতার ও সাফল্যের দিক খেকে আল মাহমদের কীর্তি সত্যিকার অর্থেই অতুলনীয় । ( উৎপল ভট্টচার্য -সম্পাদক কবিতীর্থ, কলকাতা ) । “মিথ্যাবাদী রাখাল” কাব্য গ্রন্থে বেজে উঠেছে সেই দুর্মর কবিকন্ঠ-পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিদের কবিতায় যা আমরা খুযে পাই। সম্ভবত এই কাব্যগ্রন্থে তিনি অতিক্রম করেছেন তাঁর সম-সাময়ি দের। (আবিদ আজাদ ব্যাক প্রচ্ছদ- মিথ্যাবাদী রাখাল )

আল মাহমুদ শাসন-শোষণ-ত্রাসনে নিষ্পিষ্ট স্বদেশের কণ্টকাকীর্ণ পথচলায় নিজেকে জড়িয়েছেন শুধুমাত্র প্রকৃত কবিআত্বার অন্তর্গত তাড়নায়। এরপরেও যখন শুধুমাত্র বিশ্বকে ভিত্তি করে তাঁর কবিতা আর কবি সত্ত্বার অবমূল্যায়ন দেখি তখন তাকে সাংস্কৃতিক দুর্বৃত্তায়ন ছাড়া আর কী বলতে পারি।

কবি’র ৭৮তম জন্মদিনে শ্রদ্ধা তর্পন

আল মাহমুদ আপনি শতবর্ষী হউন। আপনার কর্নিয়াহীন চোখ, আপনার উল্টানো চোখ আামাদের অসঙ্গিতি দেখুক  আর আপনার হাত তা লিখে দিক অবলীলায়।

http://www.bdbreaking24.com/view.php?id=2920#.Ux2rTM7bTLN