৫২-৭১ : আল মাহমুদের কবিতার রাজনীতি

ড. ফজলুল হক তুহিন
রাজনীতি আধুনিককালে ব্যক্তিজীবনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। আধুনিক মানুষের জীবন যেমন রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, তেমনি আধুনিক মানুষের সৃষ্ট কবিতাও রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনার যোগসূত্রে আবদ্ধ। বাংলাদেশের কবি আল মাহমুদ, প্রতিনিধিত্বশীল ও অপরিহার্য কবি। নারী ও প্রকৃতিকেন্দ্রিক  কবিকৃতিতে আত্মপ্রতিষ্ঠার খ্যাতি তাকে সমাজ-রাজনীতিবিমুখ করেনি; বরং এসবের মধ্যেও নারী ও প্রকৃতির অর্ন্তবুনন করেছেন; আবার নারী-প্রকৃতিতে রাজনীতির। কেননা তিনি উপমহাদেশের রাজনীতিচেতন কবিতার উত্তরাধিকার ধারণ করে কবি হয়ে উঠেছেন। কৈশোর থেকে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের প্রচারপত্রে কবিতা লেখা থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত তিনি এই ধারার কবিতা রচনায় সাহসী। আজীবন যুগপৎভাবে দৈশিক ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গি হয়ে উজ্জীবিত, আলোড়িত ও সন্দীপিত হয়েছেন।
বর্তমান বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমা দেশবিভাগের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছিলো ১৯৪৭ সালে। ভাষা আন্দোলনে এদেশবাসীর প্রথম স্বপ্নভঙ্গ, সঙ্গে সঙ্গে নতুন পথচলা ও উজ্জীবন।  তাই ‘একুশে ফেব্র“য়ারী’ (১৯৫৩) সঙ্কলনের অন্তর্গত কবিতাবলী শুধু কবিতা হিসেবেই মৌলিক নয়, সমাজ বিকাশের অভিজ্ঞান হিসেবেও মূল্যবান। আবার ভাষা আন্দোলন যেমন পরবর্তী সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের ওপর প্রভাব বিস্তার করে, তেমনি এই কাব্য সঙ্কলনও পরবর্তী কাব্যধারার ওপর ছায়াপাত করে। এ-সময়ে সমাজসচেতন ও সাম্যবাদী উভয় শিবিরের কবিরা স্বদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যে প্রত্যাবর্তন করে। ফলে কবিতায় পাকিস্তানবাদের স্থলে মা-মাটি-মাতৃভাষা স্থান করে নেয়। একুশে ফেব্র“য়ারি হয়ে ওঠে কবিতার উৎসব। মা, মাটি ও জনতার পাশাপাশি রক্ত, সূর্য, কৃষ্ণচূড়া ও লাল রঙ হয়ে ওঠে কবিতার বহুল ব্যবহৃত উপমা ও প্রতীক। ভাষা আন্দোলনে উজ্জীবিত আল মাহমুদের কবিতায় এইসব প্রতীক উপমার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাঙালির সংগ্রামী ইতিহাসের সাহসী ব্যক্তিত্বের প্রসঙ্গ।
ফেব্র“য়ারির একুশ তারিখ
দুপুরবেলার অক্ত
বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায়
বরকতেরই রক্ত।
হাজার যুগের সূর্যতাপে
জ্বলবে, এমন লাল যে,
সেই লোহিতেই লাল হয়েছে
কৃষ্ণচূড়ার ডাল যে!
ভাষা-আন্দোলন আবহমান বাঙালির প্রবহমান সংগ্রামের ফসলÑ এই সত্যকে কবি ইতিহাসের আলোয় স্থাপন এবং তিতুমীর, ক্ষুদিরাম ও  প্রীতিলতাÑ এই তিন আত্মত্যাগী ব্যক্তিত্বের অবদানের পাশে ভাষা শহীদের অবস্থান নির্ণয় করেন। সঙ্গে সঙ্গে কবি ‘বঙ্গে’ জন্মগ্রহণ করে বঙ্গের হাজার বছরের প্রচলিত ভাষা বঙ্গভাষা বা বাংলাভাষায় স্বতঃসিদ্ধ অধিকার জন্মেছে, এই সত্যও প্রকাশ করেন। বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলন প্রথম ছিলো একটা ক্ষুদ্র আন্দোলন আহত উঠতি মধ্যবিত্তের সংঘবদ্ধ প্রয়াস। এই সময়ে ইতিহাসের রূপান্তরে সমাজ-রাজনীতি-সংস্কৃতি ও কবিতার রূপান্তর দৃশ্যমান। এই পর্বে আল মাহমুদ ‘সমকালে’ নিয়মিত কবিতা লিখতে থাকেন সমকালীন জীবনতরঙ্গ ও সময়চেতনা ধারণ করে।
১৯৫৮ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর পূর্ববাংলার রাজনীতির স্বাভাবিক বিকাশ রুদ্ধ হয়ে যায়। বিশেষভাবে ১৯৫৮ থেকে ১৯৬১ পর্যন্ত সময় এ দেশের কবিতার জন্যে ‘চূড়ান্ত মন্দা’। এই সময়কে ধারণ করে আবির্ভাব ঘটে নতুন কবিদের। আল মাহমুদের প্রথম কাব্য গ্রন্থ লোক লোকান্তর এই সময়পর্বেই রচিত। এই কালকে তিনি ‘বড় ভয়ানক দিন’ আর সমাজকে ‘দুঃসহ দোজখ’ রূপে চিহ্নিত করেন ‘বৃষ্টির অভাবে’ কবিতায়। তবে এই গ্রন্থে স্পষ্ট রাজনৈতিক চেতনা অনুপস্থিত।
আল মাহমুদের সুস্পষ্ট রাজনৈতিক ভাবনা ক্রিয়াশীল দ্বিতীয় কাব্য ‘কালের কলসে’ (রচনাকাল: ১৯৬৪-৬৭)। এই কালপর্বে পূর্ব-বাংলার রাজনীতি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে। দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণী স্বায়ত্বশাসনের (১৯৬৬) দাবিতে সোচ্চার হয় এবং কবিতার এক ‘নতুন অধ্যায়ের উদ্বোধন’ ঘটায়। সমকালের বিপন্নতাবোধ ও ক্ষোভকে এখানে তিনি নিগুঢ়ভাবে অনুভব এবং রাষ্ট্রীয় দমননীতি সত্ত্বেও পরিবেশের বিরুদ্ধে ব্যক্তি স্বাধীনতা ও প্রতিবাদকে উচ্চকিত করেন। এই কাব্যের বিশিষ্ট নতুন সুর হলো ‘সমকাল ও স্বদেশ সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট রাষ্ট্রিক চেতনা’। যা পূর্ববর্তী গ্রন্থে ছিলো শুধুই মানবিকতার বোধ, এখানে তা সুনির্দিষ্ট একটি ‘শাসক-বিরোধী স্বরে’ পরিণত হয়েছে। ‘রবীন্দ্রনাথ’ কবিতায় সেই সময় বাস্তবতা ও কবির অন্তর্গত বিক্ষুব্ধতা ধ্বনিত।
এ কেমন অন্ধকার বঙ্গদেশ উত্থান রহিত
নৈশব্দের মন্ত্রে যেন ডালে আর পাখিও বসে না।
নদীগুলো দুঃখময়, নির্পতঙ্গ মাটিতে জন্মায়
কেবল ব্যাঙের ছাতা, অন্যকোন শ্যামলতা নেই।
এই অন্ধকারময় ‘বঙ্গদেশ’ সামরিক শাসনে বন্ধ্যাভূমি বা পরিত্যক্ত জমিনে (ডধংঃ খধহফ) পরিণত হয়েছে। সুমিতা চক্রবর্তীর মতে- এ রকম একটি কবিতাই বাক্রুদ্ধ জনতার মনে নিয়ে আসে বিদ্যুতের ঝলক, সত্যিকারের অস্ত্র হয়ে ওঠে। ষাটের দশকের প্রথমার্ধে পূর্ববাংলায় এ রকম একটি কবিতা লেখাই ছিলো সংগ্রাম। অন্যদিকে ‘ছয় দফা’ কেন্দ্রিক রাজনৈতিক আন্দোলনের অভিঘাতে সামাজিক উজ্জীবন ও রাজনৈতিক চেতনার জাগৃতি ঘটে এবং কবিতায় তার ঢেউ আছড়ে পড়ে। এই সময়ই কবিদের মধ্যে আত্মজাগরণ, আত্মআবিষ্কার  ও আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান লক্ষণীয়। আল মাহমুদের ‘নিদ্রিতা মায়ের নাম’ কবিতায় সেই মনোভঙ্গি রূপান্তরিত। তাড়িত দুঃখের মতো চতুর্দিকে স্মৃতির মিছিল
রক্তাক্ত বন্ধুদের মুখ, উত্তেজিত হাতের টঙ্কারে
তীরের ফলার মত
নিক্ষিপ্ত ভাষার চিৎকার:
বাঙলা, বাঙলাÑ
মা ও মাতৃভূমি অভিন্ন যোগসূত্রে ‘দেশজননী’ হয়ে ওঠে জনতার মিছিলে ও কবির কবিতায়। কবি তীব্র আশা ও সম্ভাবনায় প্রত্যক্ষ করেন ‘কালের কহ্লার’। সেজন্যে ‘বাঙলা’ মায়ের হারানো সম্পদ ও ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে কবি অঙ্গীকারবদ্ধ। ‘নোলক’ তাই বাঙলা মায়ের যুগসঞ্চিত প্রাণ-ঐশ্বর্যের প্রতীক হয়ে ওঠে।
আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে
হেথায় খুঁজি হোথায় খুঁজি সারা বাংলাদেশে।
রাজপথে জনগণ স্বাধিকার ও স্বায়ত্বশাসনের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ঘরে না ফেরার অঙ্গীকারে উদ্দীপ্ত। এমনিভাবে কবিও গণমুখী জীবনবোধে সন্দীপিত হয়ে বাঙলা মায়ের হারানো ‘গয়না’ বা সম্পদ স্বাধিকার ফিরিয়ে না আনা পর্যন্ত ঘরে প্রত্যাবর্তন করবে না। জনগণ ও কবির কণ্ঠস্বর একই সুরে মিলিত হয়েছে স্বাদেশিকবোধে ও রাজনৈতিক প্রত্যয়ে। এই কালপর্বে আল মাহমুদ সম্ভাব্য জাগরণের আহ্বান জানান নিজস্ব কাব্যভাষায়Ñ ‘মন্ত্র’ কবিতায়।
গণঅভ্যুত্থান (১৯৬৯) জাতীয় রাজনীতিতে বিপুল সম্ভাবনার সৃষ্টি করে। উপনিবেশিক শাসনের সঙ্গে সম্মুখ সংঘাতে আন্দোলনরত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সাফল্য একটা অনিবার্য পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে থাকে। অন্যদিকে সমগ্র দেশব্যাপী গণজোয়ারের তরঙ্গ এসে পড়ে কবিতায়। এ সময়ের কাব্যে উদ্দীপ্ত জনসাধারণের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম উত্তাপ ছড়ায়। আল মাহমুদের কবিতায় সরাসরি গণঅভ্যুত্থানের ঢেউ আন্দোলিত। এই মুক্তি সংগ্রামে শহীদের ভূমিকা ও অবদানকে স্মরণ করে সামনের প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রেরণা তাঁর “ঊন সত্তরের ছড়া-১” ও “ঊন সত্তরের ছড়া-২”-এ প্রকাশিত।
ট্রাক! ট্রাক! ট্রাক!
শুয়োর মুখো ট্রাক আসবে
দুয়োর বেঁধে রাখ।
কেন বাঁধবো দোর জানালা
তুলবো কেন খিল?
আসাদ গেছে মিছিল নিয়ে
ফিরবে সে মিছিল।

http://saptahikmuktovabna.com/news/2013/06/23/127.html