স্বাক্ষাত্কারে আল মাহমুদ : ‘বিশ্বাসী মানুষ কি সাম্য চাইতে পারে না?’

সাক্ষাত্কার নিয়েছেন আলতাফ শাহনেওয়াজ ও ফাতেমা আবেদীন নাজলা
দ্বিধা
চলতে চলতে থমকে দাঁড়াই
কে আমার নাম হাঁক দিয়ে বলে
দাঁড়াও পথিক,
দাঁড়িয়ে এবার ঠিক করে নাও
যাবে কোন দিক।
তুমি কি শুনতে পাচ্ছ তোমার
নাম ডাকে কারা?
হাতছানি দেয় চারদিক হতে
যেন দিকহারা,নিশানাবিহীন ঠিকানাবিহীন
কার ঘরে যাব?
এই অবেলায় গোধূলির খেলা
করছে আমাকে ধুলোয় মলিন,
কাকে ফিরে পাব!
তোমার আঁচল মুখে এসে লাগে
হাওয়ার পলক ছোঁয় দুটি চোখ
করে ধুকপুক হূদয়ের ধ্বনি
উঠে রণি রণি—আমাকে নিয়েই।
আমি শেষ বেলা ছেড়ে ছেলেখেলা
থমকে দাঁড়াই
এক পা বাড়াই—
কোন দিকে যাব?

শেষ ট্রেন ধরবো বলে এক রকম ছুটতে ছুটতে স্টেশনে পৌঁছে দেখি
নীলবর্ণ আলোর সংকেত। হতাশার মতন হঠাত্
দারুণ হুইসেল দিয়ে গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে।
যাদের সাথে শহরে যাবার কথা ছিল তাদের উত্কণ্ঠিত মুখ
জানালায় উবুড় হয়ে আমাকে দেখছে। হাত নেড়ে সান্ত্বনা দিচ্ছে।
আসার সময় আব্বা তাড়া দিয়েছিলেন, গোছাতে গোছাতেই
তোর সময় বয়ে যাবে, তুই আবার গাড়ি পাবি?
আম্মা বলেছিলেন, আজ রাত না হয় বই নিয়েই বসে থাক
কত রাত তো অমনি থাকিস।
আমার খুব ঘুম পেল। এক নিঃস্বপ্ন নিদ্রায় আমি
নিহত হতে থাকলাম।
অথচ জাহানারা কোনোদিন ট্রেন ফেল করে না। ফরহাদ
আধ ঘণ্টা আগেই স্টেশনে পৌঁছে যায়। লাইলী
মালপত্র তুলে দিয়ে আগেই চাকরকে টিকিট কিনতে পাঠায়। নাহার
কোথাও যাওয়ার কথা থাকলে আনন্দে ভাত পর্যন্ত খেতে পারে না।
আর আমি এদের ভাই
সাত মাইল হেঁটে এসে শেষ রাতের গাড়ি হারিয়ে
এক অখ্যাত স্টেশনে কুয়াশায় কাঁপছি।
কুয়াশার শাদা পর্দা দোলাতে দোলাতে আবার আমি ঘরে ফিরবো।
শিশিরে আমার পাজামা ভিজে যাবে। চোখের পাতায়
শীতের বিন্দু জমতে জমতে নিলর্জ্জের মতো আমার মুখের ওপর রোদ
নামলে, সামনে দেখবো পরিচিত নদী। ছড়ানো ছিটানো
ঘরবাড়ি, গ্রাম। জলার দিকে বকের ঝাঁক উড়ে যাচ্ছে। তারপর
দারুণ ভয়ের মতো ভেসে উঠবে আমাদের আটচালা।
কলার ছোট বাগান।
দীর্ঘ পাতাগুলো না না করে কাঁপছে। বৈঠকখানা থেকে আব্বা
একবার আমাকে দেখে নিয়ে মুখ নিচু করে পড়তে থাকবেন,
ফাবি আইয়ে আলা-ই-রাব্বিকুমা তুকাজ্বিবান…।
বাসি বাসন হাতে আম্মা আমাকে দেখে হেসে ফেলবেন।
ভালোই হলো তোর ফিরে আসা। তুই না থাকলে
ঘরবাড়ি একেবারে কেমন শূন্য হয়ে যায়। হাতমুখ
ধুয়ে আয়। নাস্তা পাঠাই।
আর আমি মাকে জড়িয়ে ধরে আমার প্রত্যাবর্তনের লজ্জাকে
ঘষে ঘষে
তুলে ফেলব।
(প্রত্যাবর্তনের লজ্জা)

‘কবিতাটি খুব ভালো ছিল’—বলেই চোখের জল মুছলেন কবি আল মাহমুদ। আমাদের মুখে নিজের কবিতাটি শুনে তিনি কাঁদছিলেন। কবিতায় লেখা মা-বাবা, ভাইবোনের কথা মনে করে এই কান্না শিশুর ক্রন্দনের মতো।

মগবাজারে নিজের শয়নকক্ষে খাটের ওপর বসে এরপর কিছুক্ষণ দু-চোখের অশ্রুকে গোপন করার চেষ্টা। নীরবতা। এক সময় বললেন, ‘জানো, আমাদের পরিবারের সবাই সব সময় আমাকে বলত, আমি গাড়ি ফেল করব। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঘটতও তা-ই। গাড়ি ফেল করে, গভীর রাতে মাইলের পর মাইল হেঁটে বাড়ি ফিরতাম। আম্মার কাছে। আর আমার প্রত্যাবর্তন দেখে হেসে উঠতেন আম্মা। আসলে জীবনের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সময়ের কাজ সময়ে করতে পারিনি আমি। তাই একসময় মনের গহিন থেকে উঠে এসেছিল এ কবিতাটি। আমার সামনে তোমরা যখন কবিতাটি পড়লে, আম্মার মুখ ভেসে উঠল, তাঁর সেই হাসিমুখ দেখতে পেলাম যেন।’

তাঁর মুখে আর কোনো কথা নেই। কেবল মৃদু কান্নার শব্দ। কাজে-অকাজে আল মাহমুদের বাড়ি প্রায়ই যাওয়া হয়। এবার এসেছি সাক্ষাত্কার নিতে—আমাদের মুখে এ কথা শুনেই একটু চুপসে গেলেন কবি।

‘সাক্ষাত্কার তো দিতে পারব না। বৃদ্ধ মানুষ, চোখে দেখতে পাই না। সবকিছু ঠিকমতো মনেও থাকে না। বয়সের ক্লান্তি, বুঝেছ? তাই সাক্ষাত্কার হবে না, এমনি কথাবার্তা বলতে চাইলে বসো।’

আমরা তাতেই রাজি। কবির সঙ্গে আটপৌরে কথাবার্তায় তাঁর নিজের আয়নায় দেখতে চাই তাঁকে।

শুরুতে প্রশ্নকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন নিজেই। আমাদের বললেন, তোমাদের কী প্রশ্ন বলো তো?

জীবন আসলে কেমন?—দীর্ঘ ৭৮ বছর পাড়ি দেওয়া আল মাহমুদের কাছে প্রথম প্রশ্ন।

‘অন্যান্য মানুষের সঙ্গে কবির জীবনের তফাত আছে। কারণ, কবিরা তো স্বপ্ন দেখে এবং দেখায়।’

নিজের ঘরে খাটের ওপর বসে গম্ভীর স্বরে পরপর দু-বার বললেন কথাটি। ‘তবে কবিদেরও এই দুনিয়ার বাস্তবতায় থাকতে হয়, বাস করতে হয় সবার সঙ্গে। তাই কবিদের খানিক স্বপ্নে খানিক বাস্তবতায় মিলেমিশে থাকতে হয়। আমি জীবনকে এভাবেই দেখি। সবচেয়ে কঠিন সময়েও আমি ভেবেছি, ভালোই তো আছি!’

৭৯ বছর বয়সে পৌঁছে আপনার জীবনের উপলব্ধি কী?—এমন প্রশ্নে একটু থমকে যাওয়া। তারপর বললেন, ‘জীবনপোলব্ধি হলো, ভালোই তো কেটেছে।’ এবারও কথাটি বললেন দুবার—’ভালোই তো কেটেছে।’

এত ভালো জীবন কেটেছে যে কবির, তাঁর জীবনে খারাপ লাগার কিছুও ছিল, দুঃসময়ও ছিল। সেই কৌতূহল থেকে জানতে চাইলাম, এই দীর্ঘ জীবনের কোন অংশটুকু না থাকলে খুব ভালো হতো? এখন যদি নিজের জীবনকে সমপাদনা করতে পারতেন, তবে পেরিয়ে আসা জীবনের কোন অংশকে বাদ দিতেন?

প্রশ্নটি আল মাহমুদের জন্য যেন একটু কঠিন হয়ে গিয়েছিল। তাই পাল্টা জিজ্ঞাসা তাঁর মুখে, ‘বাদ দেওয়া বা সম্পাদনার কথা আসছে কেন—কেন এডিট করব? আমি তো তেমন লেখাপড়া করিনি, মূর্খ মানুষ। মূর্খ মানুষ হলেও সারাজীবন লেখাপড়া নিয়েই থেকেছি। একটা জীবন কাটিয়ে দিলাম পড়তে পড়তে। যতদিন চোখ ছিল দেখে পড়েছি, যখন থেকে দেখতে পাই না, হাতড়ে পড়েছি। এ জীবনে অনেক দেশ ভ্রমণ করেছি—এক অর্থে সারা পৃথিবী ভ্রমণ। আমি ধনবান লোক নই; কিন্তু আমার সৌভাগ্য যে, নানা কারণ ও সমপর্কের জের ধরে আমি ঘুরে বেড়িয়েছি দেশ-বিদেশ।’

এটুকু বলে থামলেন। এর মধ্যে কথার খেই হারিয়ে ফেলেছেন। তাই আবার জানতে চাইলেন প্রশ্নটি। মনে করিয়ে দিলাম—কোন অংশটা বাদ দিতে পারলে খুশি হতেন?

একটু নড়েচড়ে বসলেন। তাঁর গলায় এখন বেশ জোর। বললেন, ‘আমার মনে হয়, তোমাদের প্রশ্নটা ঠিক নয়। আমি নিয়তিতে বিশ্বাস করি—অদৃষ্ট রয়েছে। আমি তো আমার জীবন সাজাইনি। নিজের জীবন নিজে সাজাতে পারলে বলতে পারতাম, কোন অংশটুকু না থাকলে ভালো হতো। এই জীবন আমার অদৃষ্ট সাজিয়েছে। আমার তো সাধ্য নেই এখান থেকে কিছু বাদ দেওয়ার। তোমাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে বলতে হয়, এ জীবনে আমার সব অংশই সমান গুরুত্বপূর্ণ। এর কোনো অংশ না থাকলে জীবন অপূর্ণ থাকত। আসলে মানুষকে পূর্ণ হতে হলে সকল অবস্থার মধ্য দিয়ে দোল খেতে হয়। জীবনানন্দ দাশের কথায় “হাঙরের ঢেউয়ে লুটোপুটি খেতে হয়।” হ্যাঁ, এ কথা ঠিক, ভয়ংকর হিংস্র সময়ের সঙ্গে বাস করেছি, আবার খুব ভালো সময়ও কাটিয়েছি। সুখ বলে একটা কথা আছে। যাপিত জীবনে এই সুখ সত্যিকার অর্থে মানুষ পায় না—এটা আমার বিশ্বাস।’

কেন পায় না সুখ?

‘সুখ আসলে একটা অনুভূতি। তোমাকে দেখলাম, সুখ লাগল। তুমি আমার বন্ধু হও—ভালো লাগল, এটাই সুখ। তবে আমার মতে, দুঃখই হচ্ছে জীবন। সবসময় একটা অভাব বোধ করছ, কী যেন পাওনি—এই তাড়না থেকেই তো বেঁচে থাকা।’

আপনি কি বলতে চাচ্ছেন, দুঃখ মানুষকে সৃষ্টিশীল করে তোলে?

‘না, এর পাশাপাশি সুখ আছে, প্রেম আছে। ধরো, কোনো নারীকে ভালোবাসলাম—এটাও তো একটা বিষয়, আমার জীবনের বিষয়। আমার বিশ্বাস হলো, নারীরা মানুষকে প্রতিশ্রুতি দেয়। এটা নারী ছাড়া আর কেউ দিতে পারে না। তবে এ কথাও ঠিক, নারীদের কেউই প্রতিশ্রুতি রাখে না। কিন্তু নারীর প্রতিশ্রুতি ছাড়া আবার জীবনও চলে না! কোনো পুরুষ হয়তো নারীর কাছ থেকে ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি পেল—”তোমাকে ভালোবাসি।” তখন তার যে অনুভূতি, সেটাই সুখ, সেটাই পাওয়া।’

সুখের ব্যাখ্যা হাজির করতে করতে এ সময় নিজের জীবনের অসহায় মুহূর্তগুলোর কথাও বললেন কবি—তাঁর চাকরিহীন দিনগুলোর কথা, ‘ঢাকা শহরে আমার কোনো মুরুব্বি ছিল না যে আমাকে পৃষ্ঠপোষকতা দেবে, টাকা দেবে। তো, যখন চাকরি-বাকরি ছিল না, ঠিকমতো খেতে পারতাম না, বেকার ঘুরে বেড়াতাম। সেই সময়গুলো নিয়ে খুব আক্ষেপ হয়।’

জীবনের আক্ষেপের কথা বলতে ভালো লাগছিল না। তাই নিজ থেকেই বললেন, ‘অন্য কোনো প্রসঙ্গে কথা হোক।’

তাঁর আত্মজীবনী ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’-এর সূত্র ধরে কবির শৈশবের কথা এল। বললাম, ছেলেবেলায় আপনি তো লাঠি খেলা করতেন?

‘হ্যাঁ, মহররমের মাসে আমরা লাঠি খেলতাম। আমার দাদা ছিলেন শখের লাঠিয়াল—ভীষণ লাঠি খেলার বাতিক ছিল তাঁর। আমাকে তিনি লাঠি খেলার কলাকৌশল শিখিয়েছেন। আমি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সম্ভ্রান্ত মোল্লা বাড়ির ছেলে। লোকে এক নামে চিনত আমাদের। আব্বা ছিলেন সংগীতপাগল মানুষ। আমার ছেলেবেলার নানা রং আছে।

মনে আছে প্রথম যে স্কুলে লেখাপড়া করেছি, আমাদের বাড়ি থেকে সেটা ছিল অনেক দূরে—নাম মিডল ইংলিশ স্কুল। প্রথমদিন স্কুলে একটা আচকান পরে গিয়েছিলাম। ক্লাসে ঢুকেই দেখি, আমার সহপাঠী সবাই ব্রাহ্মণের ছেলে, উঁচুজাত। একদম শেষ বেঞ্চে একটা মুসলমান ছেলে ছিল—তার নাম রহমতুল্লাহ। ক্লাসে ঢুকেই ব্রাহ্মণ সহপাঠীদের পাশে বসে পড়লাম। সেদিন যে শিক্ষক আমাদের ক্লাসে ঢুকলেন, তাঁর নাম গজেন্দ্র বিশ্বাস। ঢুকেই তিনি আমায় বললেন, তুমিই মোল্লা বাড়ির ছেলে? আমি মাথা নাড়ালাম। স্যার তখন হাসতে হাসতে বললেন, এতদিন বামুন-কয়েতদের পিটিয়ে মানুষ করেছি, এখন মোল্লা এসে হাজির হয়েছে।’

কবির চোখেমুখে শৈশব-স্মৃতির সোনালি রোদ। সেই রোদ মেখে কবিতার কথা এল এরপর। আপনাদের বাড়িতে কবিতাচর্চার চল ছিল কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে বললেন, ‘আমাদের বাড়ির পরিবেশটাই ছিল ভিন্ন রকমের। সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তখন বাংলা ভাষা কম বলা হতো। বাইরে বাংলা বললেও বাড়ির ভেতরে উর্দু আর ফার্সির চল-ই ছিল বেশি। আমার দাদা-দাদি নিজেদের মধ্যে চোস্ত ফার্সিতে কথা বলছেন—ছেলেবেলায় এটা আমি নিজেই দেখেছি। আমার পরিবারের লোকজন কবিতা পড়তেন—উর্দু ও ফার্সি ক্লাসিকাল কবিতা। দাদির মুখেই প্রথম শুনেছি “শাহনামা”-এর কাহিনি। আমার দাদার নাম মীর আবদুল ওয়াহাব। তিনি কবি ছিলেন—জারি-সারি লিখতেন। তাঁর একটা লেখা ছিল এমন—”পত্র পায়া হানিফায়/শূন্যে দিল উড়া,/দুই ভাই মইরা গেল/ কবুতরের জোড়া।” দাদার লেখা জারিগুলো খুব ভালো লাগত। গানগুলো গাইতে গাইতে সবাই ঘুরে ঘুরে নাচত।’

কথায় কথায় এবার বললেন তাঁর বাবার সংগীতচর্চার প্রসঙ্গ, আবার শৈশবের কথা।

‘খুব গানবাজনা পছন্দ করতেন আব্বা। কিন্তু তাঁকে দেখতে হতো আমার নানা আবদুর রাজ্জাক বাদশার ব্যবসা-বাণিজ্য। এটা আব্বার পছন্দ ছিল না। ব্যবসার কারণে মাঝেমধ্যেই কলকাতায় মাল আনতে যেতে হতো তাঁকে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জগত্বাজার ও আনন্দবাজারে আমাদের জুতা ও কাপড়ের দোকান ছিল। ফলে ব্যবসা সামলাতে গিয়ে আব্বার গানের শখ অকালেই থেমে গেল। তবে তাঁর বিষয়বুদ্ধি কিন্তু ভালো ছিল না। সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে ছিলেন তো, সেই একটা ঠাট ছিল তাঁর মধ্যে।

আমার ছোটবেলায় মোল্লা বাড়িতে একটা চল ছিল—এ বাড়ির ছেলেপুলেরা বাইরের লোকেদের সঙ্গে মিশতে পারবে না। সম্ভ্রান্ত পরিবার বলে কথা। কিন্তু সেসব নিষেধ কখনোই গ্রাহ্য করিনি আমি। গরুর রাখাল থেকে দোকানি—সব ধরনের মানুষের সঙ্গে মিশেছি, বাছবিচার করিনি। এভাবেই কবি হয়েছি। যখন প্রথম লেখালেখি শুরু করি, তখন আমি অষ্টম শ্রেণীতে পড়ি। আজ মনে হয়, দাদা কবিতা লিখতেন বলে পরিবারে আমার লেখালেখিও সাদরে গৃহীত হয়েছিল।

এখানে একটা মজার কথা বলি—আমার পুরো নাম মীর আবদুস শুকুর মাহমুদ। নামটি অনেক বড় তো, তাই লেখালেখির প্রায় শুরুর দিকেই এডিট করে নামটি ছোট করে ফেলি, মাহমুদের আগে “আল” শব্দটি বসিয়ে হয়ে যাই আল মাহমুদ। “আল” শব্দটিকে ইংরেজিতে “The” বলা হয়।

আল মাহমুদ এখন হাসছেন। খাটের ওপর বসে পরক্ষণেই তাঁর মুখ দিয়ে বের হলো, ‘আমার ডাকনাম পিয়ারু। সে-সময় কলকাতায় পিয়ারু নামে বিখ্যাত এক কাওয়ালি গায়ক ছিলেন। আমার আব্বা ছিলেন তাঁর গানের ভক্ত। আমার জন্মের পর ওই বিখ্যাত গায়কের নামে তিনি আমার নাম রেখেছিলেন। অনেক আদর করে রেখেছিলেন নামটি।’

কবিজীবনের প্রথম দিককার কথা জানতে চাইলে বেশ হাসিখুশি হয়ে উঠল শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখটি।

‘প্রথম প্রথম কবিতা পড়তে ভালো লাগত—কেমন যেন ঘোরের মতো। রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে ত্রিশের দশকের সব কবির বই-ই পড়েছি। মনে আছে, জীবনান্দ দাশের “ধূসর পাণ্ডুলিপি” পড়ে মনের মধ্যে কেমন যেন হলো। মনে হলো, এ এক অন্য রকম জিনিস! এভাবে পড়তে পড়তেই আগ্রহ জেগে উঠল—কী খেয়ালে লিখে ফেললাম কবিতা। তখন মনে হয়েছিল, আমিও তো পারি!’

তবে প্রথম কবিতা লেখার পর সেটি কাকে শুনিয়েছিলেন, এ কথা আর মনে করতে পারেন না আল মাহমুদ। ঘরের শূন্য দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বারবার স্মৃতি হাতড়ান। এক সময় বলেন, ‘কবি হতে কী কী করা লাগে, কোন পথে হাঁটতে হয়, প্রথম প্রথম সে-সবের কিছুই জানতাম না, কিন্তু ছোটবেলা থেকেই আই উইশ টু বি অ্যা পোয়েট। তখন পত্রপত্রিকায় অনেক সংকোচ নিয়ে লেখা পাঠাতাম। সেটা ছাপা হয়ে যেত। সুখের কথা হলো, আমার কোনো লেখাই পত্রিকার সমপাদকদের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়নি। এটাকে জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে মনে হয়।’

কবি হওয়ার রাস্তাটি এখনো অজানা তাঁর। বললেন, ‘পড়তাম এবং পড়তাম। আমাদের এলাকায় লালমোহন স্মৃতি পাঠাগার নামে একটি লাইব্রেরি ছিল। ওখান থেকে বই নিয়ে পড়তাম—”ছোটদের রাজনীতি”, “ছোটদের অর্থনীতি”, “ইতিহাসের ধারা”—এসব বই। এটা চালাত কমিউনিস্ট পার্টির লোকেরা। মোল্লা বাড়ির ছেলের বইয়ের প্রতি অগাধ আগ্রহ দেখে তাঁরা আমাকে খুব অ্যাপ্রিশিয়েট করতেন। চাইতেন আমি যেন বাম ঘরানার দিকে ঝুঁকে যাই।’

তখন থেকেই কমিউনিজমের প্রতি আপনার টান…?—কথাটি শেষ হলো না। মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলতে শুরু করলেন আল মাহমুদ।

‘তাঁরা আমাকে বই দিতেন। ওই বইগুলো পড়ে মনে মনে কমিউনিজমের ওপর একটা আবেগের জায়গা তৈরি হয়েছিল। আমার ওপর বামপন্থার একটা প্রভাব ছিল। কিন্তু সেটা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কারণ, পরিবারের পরিবেশটা সে রকম ছিল না। রক্ষণশীল মোল্লা বাড়িতে থাকার কারণেই বামপন্থি হওয়া যায়নি। মোল্লা বাড়িতে জন্মানোর কারণে ধর্মকে উপেক্ষা করে অন্য কোনো ধ্যানধারণায় যেতে পারিনি আমি। ধর্ম ও কমিউনিজম—এই দুই ধারা একসময় মনের মধ্যে দ্বিধার তৈরি করেছে, কনফ্লিক্ট করেছে। আর দ্বন্দ্ব ছিল বলেই ধর্মের কাছে ফিরে আসতে পেরেছি আমি। সে যা হোক, ছোটবেলার কথা বলছিলাম। তো, এ সময় আমি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সম্ভ্রান্ত বাড়ির গৃহবধূদের সঙ্গেও বই লেনদেন করতাম।’

শুধুই লেনদেন, পড়াশোনা—কখনো বই চুরি করেননি?

‘করেছি। তবে এটাকে আমি চুরি বলি না। সবাই এটা করে—পড়তে এনে ভালো লাগার পর আর ফেরত দেয় না। আমিও এটা করেছি। আমার কয়েকজন বন্ধুবান্ধব বেশ পাকা চোর ছিলেন—বাড়িতে এসে জামার নিচে লুকিয়ে বই নিয়ে চলে যেতেন। আমি কখনো কখনো বুঝতাম; কিন্তু চক্ষুলজ্জায় কিছুই বলতে পারতাম না। এখানে এটুকু বলি যে, আমি কখনো প্রকাশ্যে বই চুরি করিনি।’

মাহমুদ ভাই, কেউ তো প্রকাশ্যে বই চুরি করে না—কথাটি বলতেই আবার সরব তাঁর কণ্ঠ। সেই কণ্ঠে এখন অস্বস্তির ছাপ স্পষ্ট।

‘কোনো বই পড়তে এনে ভালো লাগলে অনেক ক্ষেত্রে আমি আর সেটা ফিরিয়ে দিতাম না। যদি চুরি বলো, সেটাই ছিল আমার চুরি। কিন্তু আমি একে চুরি মনে করি না—এটাকে একজন পাঠকের পড়ার তৃষ্ণা বলা যায়।’

বই চুরি প্রসঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগছে না তাঁর। চোখেমুখে প্রচণ্ড বিরক্তি। ‘তোমাদের পরের প্রশ্ন কী?’—আমাদের কাছে কবির জিজ্ঞাসা।

জানতে চাইলাম, যেসব সুন্দরী সম্ভ্রান্ত গৃহবধূর সঙ্গে আপনার বই লেনদেন ছিল, তাঁদের কখনো নিজের লেখা কবিতা পড়তে দেননি?

লাজুক হাসলেন এবার। তারপর এড়িয়ে যাওয়ার ছলে বললেন, ‘দিয়েছি হয়তো। দিয়েছি। আমার প্রথম কবিতা যখন ছাপা হয়, সবাইকে দেখিয়েছিলাম। তবে কবিতার আগে প্রথম আমার গল্প ছাপা হয়েছিল। কলকাতার ‘সত্যযুগ’ পত্রিকায়।’

এই যে গৃহবধূদের সঙ্গে এত মেলামেশা, বই লেনদেন; প্রেম জাগেনি কারও জন্য?

এবার প্রশ্ন শুনে একটু খেপেই গেলেন। আল মাহমুদের ঘরে খাটের পাশে সোফায় বসে আছেন তাঁর বড় ছেলে শরীফ মাহমুদ। ছেলের সামনে এ বিষয়ে কীভাবে কথা বলবেন! অস্বস্তি, লজ্জা—সবকিছু মিলেমিশে একাকার তাঁর মুখ। দৃষ্টিতে রাগের অভিব্যক্তি। ‘ওরা সবাই আমার বড় ছিল তো।’—এক বাক্যেই উড়িয়ে দিতে চাইলেন প্রেমের কথা। সে মুহূর্তে ঘর ভরে উঠল নৈঃশব্দ্যে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে একসময় আপন মনেই বললেন, ‘খুব রূপসী ছিলেন সবাই। ছিলেন সমাজের খুব উঁচু শ্রেণীর মানুষ।’

কিন্তু তাঁদের কারও প্রতি প্রেম জাগেনি, প্রেম আসেনি আপনার জীবনে?—আবারও একই প্রশ্ন।

‘অতটা অনুভূতি হয়নি। হলেও হতে পারে।—মাত্র দু-লাইনেই উড়িয়ে দিলেন প্রসঙ্গটি।

এদিকে প্রসঙ্গটির পেছনে তখনও লেগে আছি আঠার মতো। চেপে ধরলাম কবিকে—সে-সময় কোনো একজনকে দেখেও মনে দোলা লাগেনি আপনার?

কয়েকবার বলার পর একটু ইতস্তত করে তিনি বললেন, ‘হয়েছিল।’

ততক্ষণে আমরাও পেয়ে গেছি সুযোগ। ‘আপনার প্রথম প্রেম, সত্যিকারের প্রেম সম্পর্কে বলুন’—ক্রমাগত উসকাতে চেষ্টা করছি তাঁকে। আর ওদিকে বারবার তিনি ধমক দিচ্ছেন আমাদের—’তোমরা পাগল নাকি! কী বলছ এসব!’

অবশেষে মুখ খুললেন, ‘আমাদের শহরেরই একজন।’

আমরা দেখলাম, ঢাকায় বসবাসরত ৭৯ বছরের আল মাহমুদ ক্রমেই সলজ্জ এক কিশোর হয়ে উঠছেন, এ মুহূর্তে তিনি যেন হয়ে উঠেছেন ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার মৌড়াইলের সেই পিয়ারু; ‘বলব না বলব না’ করেও যিনি বলে চলেছেন কিশোরবেলার প্রথম প্রেমের কথা।

‘সে ছিল আমার সমবয়সী। অসাধারণ টান ছিল তার প্রতি। বইপত্র আদান-প্রদান করতে গিয়েই পরিচয় হয়েছিল। কিন্তু তাকে কখনোই বলা হয়নি ভালোবাসার কথা। আমার পক্ষে তখন তাকে ভালোবাসার কথাটি বলা ছিল অসম্ভব ব্যাপার।’

কেন বলতে পারলেন না?—কবিকে যখন এ প্রশ্ন করেছি, ততক্ষণে আমাদের ওপর রেগে আগুন তিনি।

‘তোমরা কি বুঝতে পারছ না, সেই সময়ে কাউকে এটা বলা যেত না। ভীষণ রক্ষণশীল ছিল সময়টা। তার ওপর আমি মোল্লা বাড়ির ছেলে। আকার ইঙ্গিতেও বলতে পারিনি। একা একাই ভালোবেসেছি। তার কাছ থেকে কোনো সাড়া পাইনি। তাই আদৌ জানি না আমাকে সে ভালোবাসত কিনা। তাঁকে নিয়ে সরাসরি কোনো কবিতা লেখা হয়নি। কিন্তু তার সৌন্দর্যগাথা আমার অনেক কাব্যেই আছে।’

নাম কী তাঁর, প্রথম ভালোবাসার মানুষের?

আল মাহমুদ নামটি বলতে নারাজ। তাই এক পর্যায়ে অন্ধকারে ঢিল ছুড়ে তাঁকে বললাম, বলবেন না তো; ঠিক আছে আমরাই বলে দিচ্ছি নামটি—আয়েশা আক্তার—’কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা আক্তার।’

নাম বলার সঙ্গে সঙ্গে অস্ফুটভাবে মাথা নাড়লেন কবি। বোধ হয় খানিকটা অবাকও হলেন। আমাদের মনে সে-সময় আরও অধিক বিস্ময়—কীভাবে যথাস্থানে গিয়ে পড়ল অন্ধকারের ঢিল!

‘কবিতায় আমি তার কথা বলেছি। আমার সঙ্গে সে মক্তবে পড়ত।’

এরপর আর কোনো কথা নয়, আনমনেই আওড়ে চললেন নিজের কবিতার পঙিক্ত—’কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা আক্তার।’

এর মধ্যে এক ফাঁকে বেশ শাসিয়ে নিলেন আমাদের—’কথা তো রের্কড হচ্ছে। কী সাক্ষাত্কার নিচ্ছ, আমাকে সেটা পড়িয়ে নিও। এই বয়সে এসে আমাকে নিয়ে ছেলেখেলা কোরো না। এখন আমার কোনো শত্রুমিত্র নেই। সবাই আমাকে শ্রদ্ধা করে—”কবি” বলে ডাকে। এটা আমি অর্জন করেছি।’

শোভা, বিশিদি—’যেভাবে বেড়ে উঠি’ বইয়ে যাঁদের কথা লিখেছেন, তাঁদের মনে পড়ে মাহমুদ ভাই?

প্রশ্নটি করতেই খেপে গেলেন। ‘বুজছি তো কী বলতে চাও। এ বিষয়ে এখন কথা বলব না। প্রসঙ্গটা বাদ দাও।’

প্রসঙ্গান্তর ঘটাতে হলো আমাদের। জানতে চাইলাম, তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না-হওয়ার কারণ। প্রথমে বললেন, ‘দারিদ্র্য, দারিদ্র্য।’ তারপর শোনা গেল বিশদ বিবরণ।

‘পড়াশোনায় আমার কোনো অনীহা ছিল না, ছাত্রও বেশ ভালো ছিলাম। পারিবারিক দারিদ্র্য এবং এদিক-সেদিক থাকার কারণে পড়াশোনাটা হয়নি। আমরা আসলেই খুব গরিব ছিলাম। এখনো যখন ভাইবোনদের রিইউনিয়ন হয়, সবাই মিলে আমরা সেই অভাবের গল্প করি। একেবারে না খেয়ে আমাদের থাকতে হয়নি বটে; কিন্তু কাড়াকাড়ি করে খেতে হয়েছে। এটা পড়াশোনা না হওয়ার একটা কারণ। আরেকটা কারণ হলো, ভাষা আন্দোলনের সময় একটি লিফলেটে আমার কবিতা ছাপা হওয়ায় পুলিশের খাতায় নাম উঠল। এ সময় আমাকে ফেরার হয়ে যেতে হয়েছিল। কবিতাটি ছাপা হওয়ার পর আর বাড়ি থাকতে পারলাম না। পুতুল নামে আমার এক খালাত বোন ছিল। সে আমাকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল। এক চোরাকারবারির সঙ্গে সীমান্ত পার হয়ে পালিয়ে গেলাম কলকাতা। এরপর চট্টগ্রাম ঘুরে ঢাকা—ঘুরছি শুধু ঘুরছি। সেই যে বাড়ি থেকে পালিয়ে এলাম, আমার আর বাড়ি ফেরা হয়নি। ফিরতে কি পেরেছি?’

প্রশ্নটি যেন আমাদের উদ্দেশেই। বাড়ি ফিরতে না পারার আক্ষেপে আল মাহমুদের চোখে জল। মুহূর্তেই চারপাশটা কেমন যেন বেদনাময় হয়ে উঠেছে।

কান্না শেষে একটি গোল্ডলিফ সিগারেট ধরিয়ে গুম হয়ে বসে আছেন কবি। আর ওদিকে আমরা ভাবছি, ঘরভরতি ধোঁয়ার ভেতরে কী স্মৃতি-বিস্মৃতি খুঁজছেন কবি? কয়েকদিন আগে ‘নতুনধারা’ আয়োজিত কবিতাপাঠের অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, আমি বৃদ্ধ মানুষ। এখন আমার স্মৃতিও নেই বিস্মৃতিও নেই।

আমাদের মনে পড়ছে সেসব কথা। তবু আবারও স্মৃতির কাছে ফেরা—সচল হলো কথাবার্তা।

বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকায় আপনার লেখা ছাপা হলো কীভাবে?

তাঁর বিষণ্ন মুখে ফিরে এল উচ্ছ্বাসের আভা। বললেন, ‘সবকিছু তো বইয়ে লিখেছি। এখন কি আর মনে আছে! তবে হ্যাঁ, একটা খামের ভেতর বুদ্ধদেবকে একসঙ্গে তিনটি কবিতা পাঠিয়েছিলাম। ঠিকানা লিখে দিয়েছিলেন শহীদ কাদরী। তাঁর হাতের লেখা খুব সুন্দর ছিল। এখানে একটা ঘটনা বলি—শহীদ তো আমাকে ঠিকানা লিখে দিলেন কিন্তু ঠিকানা লিখে দেওয়ার পর ওঁর মনে আর শান্তি নেই। তাঁর স্থির বিশ্বাস ছিল, তিনটি কবিতাই ছাপা হয়ে যাবে। পরে অবশ্য তিনি নিজেও কবিতা পাঠিয়েছিলেন গোপনে। তখন বিউটি বোর্ডিং ছিল আমাদের আড্ডাখানা। আমি, শহীদ, জহির রায়হান, শামসুর রাহমান, কাইয়ুম চৌধুরী, ফজল শাহাবুদ্দিন —সবাই আড্ডা দিতাম। অনেকের নাম এখন আর মনে নেই।

তো, একদিন সেখানে গিয়ে দেখি, শহীদ কাদরী টেবিলের ওপর মাথা নিচু করে বসে আছেন। সামনে ‘কবিতা’ পত্রিকাটা রাখা। আমি যাওয়ামাত্র শহীদ পত্রিকাটা আমার দিকে ঠেলে দিয়ে বললেন, নাও, দেখো, তোমার কবিতা ছাপা হয়েছে। আমি সে-সময় খুশিতে আত্মহারা। কিন্তু তখনও জানি না, ওদিনই শহীদের মা মারা গিয়েছেন। শহীদ আমাকে সেদিন বলেনওনি এ কথা। প্রকাশ্যে কান্নাকাটিও করেননি। আর আমিও আনন্দ উল্লাসের তোড়ে তাঁকে খেয়াল করিনি। বিউটি বোর্ডিংয়ের পাশেই ছিল তাঁদের বাড়ি।’

কথা বলতে গিয়ে তিনি খেই হারিয়ে ফেলেছেন। বললেন, ‘কী যেন বলছিলাম?’

আমরা মনে করিয়ে দিলাম প্রসঙ্গটি।

‘ও হ্যাঁ, বুদ্ধদেব। কবিতা পাঠানোর পর বুদ্ধদেব বসু পোস্টকার্ডে চিঠির মাধ্যমে আমাকে জানিয়েছিলেন, তোমার একটি বা দুটি কবিতা ছাপা যাবে মনে হচ্ছে। সেই পোস্টকার্ডটি অনেকদিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করেছিলাম আমি। যে সংখ্যায় আমার কবিতা ছাপা হয়, ওই সংখ্যায় জীবনানন্দ দাশের কবিতাও ছিল। জীবনান্দ দাশ আমাকে দারুণভাবে আচ্ছন্ন করেন। ফলে ওই সংখ্যায় আমার কবিতা ছাপা হওয়ায়, আনন্দের কোনো সীমা ছিল না।’

আপনার প্রথম বই ‘লোক লোকান্তর’ কীভাবে বের হলো?

‘আমরা কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীরা তো বিউটি বোর্ডিংয়ে আড্ডা দিতাম। সে-সময় তরুণ কবি-লেখক-চলচ্চিত্রনির্মাতা ও চিত্রশিল্পীরা মিলে “কপোতাক্ষ” নামে একটি প্রকাশনা সংস্থা খুললেন। তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন, আল মাহমুদের একটা বই করে দেওয়া দরকার। উদ্যোগটা নিয়েছিলেন মুহাম্মদ আখতার নামে একটা ছেলে। এভাবেই বের হয় “লোক লোকান্তর”। এটা ১৯৬২ বা ‘৬৩ সালের কথা। বইটি বের হওয়ার পর বাংলা একাডেমীতে প্রকাশনা অনুষ্ঠান হয়েছিল। সৈয়দ আলী আহসান ছিলেন বক্তা। আরও অনেকেই এসেছিলেন।’

কবিকে আমরা এবার ‘সোনালি কাবিন’ থেকে দশ নম্বর সনেটটি পড়ে শোনাই।

শ্রমিক সাম্যের মন্ত্রে কিরাতেরা উঠিয়েছে হাত

হিয়েনসাঙের দেশে শান্তি নামে দেখো প্রিয়তমা,

এশিয়ায় যারা আনে কর্মজীবী সাম্যের দাওয়াত

তাদের পোশাকে এসো এঁটে দিই বীরের তকোমা।

আমাদের ধর্ম হোক ফসলের সুষম বণ্টন,

পরম স্বস্তির মন্ত্রে গেয়ে ওঠো শ্রেণীর উচ্ছেদ,

এমন প্রেমের বাক্য সাহসিনী করো উচ্চারণ

যেন না ঢুকতে পারে লোকধর্মে আর ভেদাভেদ।

তারপর তুলতে চাও কামের প্রসঙ্গ যদি নারী

খেতের আড়ালে এসে নগ্ন করো যৌবন জরদ,

শস্যের স্বপক্ষে থেকে যতটুকু অনুরাগ পারি

তারো বেশি ঢেলে দেব আন্তরিক রতির দরদ,

সলাজ সাহস নিয়ে ধরে আছি পট্টময় শাড়ি

সুকণ্ঠি কবুল করো, এ অধমই তোমার মরদ।

কবিতার পর আবার প্রশ্ন—কীভাবে মাথায় এসেছিল ‘সোনালি কাবিন’-এর সনেটের ভাবনা?

নিজের কবিতা শুনে আল মাহমুদের চোখেমুখে তখন অন্য এক দ্যুতি। নড়েচড়ে বসলেন। ‘একটা সিগারেট দাও।’—পুত্রবধূকে বললেন কথাটি। এরপর চোখ ফেরালেন আমাদের দিকে।

‘সে-সময় আমি চট্টগ্রামের গোর্খা ডাক্তার লেন নামে একটি গলির তিনতলায় থাকতাম। আমার প্রতিবেশী ছিলেন গায়ক শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব। কবিতা লিখি বলে খুব খাতির করতেন আমাকে—একেবারে আগলে রাখতেন। চট্টগ্রামে আমি যে বাড়িতে থাকতাম, তার পাশেই থাকতেন অ্যাংলো ইন্ডিয়ান নারীরা।

তাঁদের সঙ্গে বেশ ভাব ছিল আমার। আমাকে তাঁরা কবি বলে ডাকতেন। দেখা হলেই বলতেন, পোয়েট, ওহ পোয়েট! আমি জবাব দিতাম, ইয়েস মাদাম…।

সেখানে থাকার সময় সনেটগুলো এল। চৌদ্দটা সনেটের মধ্যে প্রথম সাতটা একটানা লিখেছি। লেখার পর নিজেরই মনে হয়েছিল, অন্যরকম কিছু একটা লিখেছি। তবে চৌদ্দটা লেখার পর বহু চেষ্টা করেও আর লিখতে পারিনি। “সেনালি কাবিন” বেরিয়েছিল ১৯৭৩ সালে। সেই হিসেবে এ বছর বইটির চল্লিশ বছর পূর্তি হচ্ছে। এ উপলক্ষে কিছুদিন আগে বাংলাবাজারের প্রকাশকরা একটা অনুষ্ঠান করেছিলেন। আমাকে আমন্ত্রণও জানিয়েছিলেন। কিন্তু আমি যেতে পারিনি।

এ মুহূর্তে মনে পড়ছে না সনেটগুলো প্রথম কোথায় ছাপা হয়েছিল। তবে এটুকু মনে আছে যে প্রথম প্রথম অতটা হইচই হয়নি। কিন্তু ধীরে ধীরে সবগুলোই বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হলো। আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠল।’

বেশ একটা গর্বের হাসি আল মাহমুদের মুখে। বললেন, ‘লেখার কয়েকদিন পরই শহীদ কাদরীকে পড়ে শুনিয়েছিলাম সনেটগুলো। তিনি শুনে গম্ভীর হয়ে গেলেন।’

তিনি খুশি হননি?

‘হয়েছিলেন। তবে সেভাবে প্রকাশ করেননি। আজ এটুকু বলতে পারি, সোনালি কাবিন থেকে আমি বাংলাদেশের লোকজ শব্দের যে বিপুল অংশ অব্যবহূত ছিল, সেগুলো তুলে আনার চেষ্টা করেছি। তখন সচরাচর লোকজ শব্দ ব্যবহার করা হতো না। যেমন ধরো, আমরা বলি—কলস, কিন্তু এর লোকজ শব্দ হচ্ছে ঠিল্লা। সেটা আমার কবিতায় আমি ব্যবহার করেছি—”ঠিল্লা ভরা পানি”—এভাবে। তখনও ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর “বাংলা আঞ্চলিক ভাষার অভিধান” বের হয়নি। অভিধান বের হওয়ার পর দেখা গেল, বাংলা ভাষার অর্ধেকের বেশি শব্দই আমাদের সাহিত্যে ব্যবহূত হয়নি! কবি-সাহিত্যিকরা তো রীতিমতো থতমত খেয়ে গেলন। এই অভিধানটা আমাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ।’

এইটুকু বলে থামলেন। ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। তাঁর কথার সুতোও মোড় নিয়েছে অন্যদিকে। আবার তাঁকে ফিরিয়ে আনি সোনালি কাবিন-এ।

একদা লিখেছিলেন, ‘আমাদের ধর্ম হোক ফসলের সুষম বণ্টন/পরম স্বস্তির মন্ত্রে গেয়ে ওঠো শ্রেণীর উচ্ছেদ’—এই চেতনায় কি আপনি এখনো স্থির? কমিউনিজমের প্রভাব থেকে তো সরে এসেছেন, প্রহরান্তে পাশ ফিরে শুয়েছেন…।

‘তখন বিশ্বাস করেছিলাম তাই লিখেছিলাম। তবে এই কথাটা এখনো বিশ্বাস করি। যে কেউই সাম্য চাইতে পারে। সাম্যবাদের আকাঙ্ক্ষাকে কেবল মার্ক্সবাদী বা কমিউনিস্টদের ভাবনা বলা যাবে না। বিশ্বাসী মানুষ কি সাম্য চাইতে পারে না? কমিউনিস্টরা শ্রেণী উচ্ছেদের যে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, তা কি খুব ভালো কিছু আনতে পেরেছে পৃথিবীর জন্য? শ্রেণীহীন সমাজ তাঁরা গড়েছিলেন—সোভিয়েত ইউনিয়ন গড়ে উঠেছিল; তাতে কী হয়েছে? শেষে দেশগুলোকে ভেঙে ভেঙে স্বাধীনতা দিতে হলো—এসব আজ ইতিহাস। লার্ন দ্য হিস্টোরি, লার্ন দ্য হিউম্যানিটি।’

অনেকক্ষণ কথা বলেছেন। ক্লান্তিতে মুদে আসছে চোখ। আমাদের তাই বললেন, ‘আজ আর পারব না। তোমরা আরেকদিন আসো।’

দুই

দ্বিতীয় দফায় আল মাহমুদের সঙ্গে আমাদের কথোপকথন হলো কয়েকদিন বাদেই। শয়নকক্ষের সেই একই খাটে আধশোয়া ভঙ্গিতে তিনি। আমরা বসে আছি কবির মুখোমুখি। এর আগে, এই কিছুক্ষণ আগে আমরা যখন তাঁর ঘরে ঢুকেছি, দেখি, বেঘোরে ঘুমাচ্ছেন তিনি। বেশ কয়েকবার ডাকতেই উঠে বসলেন। ঘুম চোখে জানতে চাইলেন, কেন এসেছি।

ওই যে সাক্ষাত্কার দেওয়ার কথা ছিল।—বললাম তাঁকে। তাঁর পুত্রবধূও তাঁকে মনে করালেন বিষয়টি। এ সময় আল মাহমুদের মুখ থেকে বেরিয়ে এল দুইটি মাত্র বাক্য—’আচ্ছা, তোমরা বসো। আমি একটু খাওয়াদাওয়া করে নিই।’

তাঁর খাওয়া শেষে কথা শুরু হলো আবার :

: আজ কতক্ষণ সময় নেবে?

: খুব বেশি নয় মাহমুদ ভাই।

: আচ্ছা, শুরু করো।

গত দিনের মতো এ দিনও আমাদেরকে প্রথম প্রশ্নটি তিনিই করলেন।

আমরা বললাম, আপনার সমসাময়িক কবিদের সম্পর্কে বলুন…।

‘আমরা যাঁরা একসঙ্গে কাব্যরচনা শুরু করেছিলাম—আমি, শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী কিংবা ফজল শাহাবুদ্দিন—আমাদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব ছিল। আমরা কেউ কারও প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলাম না। বিশেষত শহীদ কাদরী, শামসুর রাহমান আর আমার মধ্যে গভীর ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব ছিল। প্রীতিভাব ছিল।’

আপনার একটি কবিতার বই শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী ও ফজল শাহাবুদ্দিনকে একসঙ্গে উত্সর্গ করে উত্সর্গপত্রে লিখেছিলেন, ‘আমাদের সাম্প্রতিক কাব্যহিংসা অমর হোক।’ শুনেছি আপনাদের মধ্যে রেষারেষি ছিল, ঈর্ষা ছিল…।

‘সমসাময়িক কবিদের মধ্যে বন্ধুত্ব, প্রীতি—এগুলো যেমন থাকে, তেমনি কখনো কখনো ঈর্ষাও কাজ করে। তবে আমাদের মধ্যে কোনো ঈর্ষা বা রেষারেষি ছিল না—একসময় দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল মাত্র।’

শোনা যায়, আপনার ও শামসুর রাহমানের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল…।

‘কোনো বিরোধ ছিল না।’—প্রায় চিত্কার করে আল মাহমুদ বললেন কথাটি।

তাহলে কথাটি চারপাশে চাউর হলো কীভাবে?

‘আমি বলতে পারব না। যাঁরা এসব করে আনন্দ পেত, এগুলো তাঁদেরই কর্ম। ডাহা মিথ্যা প্রপাগান্ডা এসব। শামসুর রাহমান আমার খুব কাছের বন্ধু ছিলেন। আমি তাঁর বিবাহের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত ছিলাম। আমি যখন কারাগারে ছিলাম, তখন তিনি আমাকে দেখতেও গিয়েছিলেন। মাঝে অনেকদিন আমাদের দেখা হয়নি; কিন্তু আমরা পরস্পর বন্ধু ছিলাম।

তাঁর প্রথম দিককার কবিতাগুলো খুবই অসাধারণ। যদিও শেষদিকের কবিতা কেমন খাপছাড়া হয়ে গিয়েছিল। শামসুর রাহমানের কাছ থেকে বাংলা সাহিত্য অনেক কিছু পেয়েছে। তবে ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এসকেপিস্ট ছিলেন।’

শামসুর রাহমানকে এসকেপিস্ট বললেন, আপনি নিজেও তো এসকেপিস্ট…।

‘না আমি এসকেপিস্ট নই। আই উইশ টুবি অ্যা পোয়েট, আই ওয়াজ অ্যা পোয়েট, আই অ্যাম অ্যা পোয়েট—আমি শুধুই কবি। আমি কবি হতে চেয়েছিলাম, কবি হয়েছি। আর্থিক অসুবিধায় জর্জরিত ছিল আমার সংসার। অভাব ছিল, না খেয়ে থাকতে হয়েছে। সংসারের প্রতি যতটা দায়িত্বশীল হওয়ার কথা, ততটা হয়তো পারিনি। আমার স্ত্রী একাই সামলে রেখেছিলেন সবকিছু। তিনি ছিলেন সংসারী নারী। সব সময় সকল সংকট থেকে দূরে রেখেছিলেন আমাকে। তাঁর কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ। তিনিই ছিলেন আমার আশ্রয়। তাঁকে আমি এত ভালোবাসতাম, এত ভালোবাসতাম…।’

এরপর অঝোর কান্নার পুনরাবৃত্তি—উচ্চৈঃস্বরে কেঁদে উঠলেন আল মাহমুদ। আর তাঁর সেই কান্নামিশ্রিত কণ্ঠে আমরা শুনতে পেলাম, স্ত্রী সৈয়দা নাদিরা বেগমের জন্য হাহাকার।

‘তাঁর মতো মানুষ এ জীবনে দেখিনি। তিনি না থাকলে আমি কবিই হতে পারতাম না—ডেস্ট্রয় হয়ে যেতাম।’

http://arifnews24.wordpress.com/2013/10/14/%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%BE%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%86%E0%A6%B2-%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%B9%E0%A6%AE%E0%A7%81%E0%A6%A6/