মুখোমুখি আল মাহমুদ – নাজমুস সায়াদাত

আল মাহমুদের নিকট হতে এবারের ঈদসংখ্যায় একটি উপন্যাস লিখে নেওয়ার দায়িত্ব আমার উপর অর্পিত হলো। একটি জাতীয় দৈনিকের এই প্রস্তাবে শত ব্যস্ততার মাঝেও না করতে পারলাম না। সেই থেকে বাংলাসাহিত্যের এই জীবন্ত কিংবদন্তীর মুখোমুখি হলাম। তার সান্নিধ্যে দিনের পর দিন যাপন করতে লাগলাম যেন! কবি যদি কথাসাহিত্যিক হয় তাহলে তার স্বাদ, আহ্লাদ, চিন্তা, ধ্যান আর তন্ময়তা কেমন হয় তার বাস্তব উপলব্ধি আমার অভিজ্ঞতার ঝুড়ির সঞ্চয় বৃদ্ধি করতে লাগলো।
প্রথম যখন লেখাটা তিনি আমাকে বলতে আরম্ভ করলেন তখন মনে হলো দৈববাণীর বর্ষণহচ্ছে। চোখ বন্ধ করে ধ্যানমগ্ন কোন ঋষির মতো প্রায় আশি ছুঁই ছুঁই একজনধীমান পুরুষ আমাকে ডিকটেশন দিয়ে চলছেন। আমি সমান্তরালে লিখি, আবার তাকে পড়েশোনাই। কাহিনীর পরম্পরা ঠিক রাখতে তিনি আমাকে বলতে থাকেন, কি লিখছি মনেআছে তো? আমি বলি, গল্পের কথক একজন নারীকে খুঁজছে। তিনি বলেন, হ্যাঁ ঠিকধরেছো। একজন নারী, যে একদা আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে পথে বসিয়ে রেখে চলেগ্যাছে। এখন আমি তাকে অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যে পৃথিবীর প্রান্তরে প্রান্তরেঘুরে বেড়াচ্ছি। আমি তো কবি, এক আন্তর্জাতিক আত্মা। আমি তিতাসের চর হতে টেমসনদীর পাড়ে, সেখান থেকে আইফেল টাওয়ারের পাশে সিন নদী ঘেঁষে প্যারিস নগরীরতুষার পরা রাস্তা ধরে হেঁটে চলছি।

গল্পের শুরুতেই আল মাহমুদ আমাকেযেন এক স্বপ্নের জগতে নিয়ে গেলেন। আল মাহমুদের যত কথাসাহিত্য বাংলাভাষাভাষী পাঠক পাঠ করেছেন, আমার মনে হলো এই লেখাটি তার ব্যতিক্রম। কারণউপন্যাসটির কাহিনীর বুনন, চরিত্র, ভাষার মাধূর্য, চিত্রকল্পের ঘনঘটা আর আলমাহমুদীয় নারীর চিত্রায়ণ একেবারেই ব্যতিক্রম মনে হতে লাগলো। এ যেনবাংলাসাহিত্যে আরেক নতুন সংযোজন। অবশ্য আল মাহমুদ এমনই। তার কাবিলের বোন, উপমহাদেশ, কবি ও কোলাহল, পুরুষসুন্দর, নিশিন্দা নারী, যেভাবে বেড়ে উঠি, যমুনাবতী, জলঅরণ্য, বিবি মরিয়মের উইল, পোড়া মাটির জোড়া হাঁস প্রভৃতিউপন্যাসের প্রতিটির তো আলাদা স্বাদ। এটিই বা কেন তার ব্যতিক্রম হবে ? তাইতো আমরা আল মাহমুদের কাছে একটি অন্যরকম উপন্যাস পেতে যাচ্ছি বলেই আমার মনেহলো।
২.
লেখার ফাঁকে ফাঁকে তিনি আমার সাথে বিভিন্ন ধরণের কথোপকথনেমেতে উঠেন। নানান কথা, নানান বিষয়, নানান ঘটনা আর স্মৃতিচারণ। সেই সাথেবিভিন্ন পংক্তির স্বকণ্ঠ আবৃত্তি। একদিন হঠাৎ বললেন, নাজমুস সায়াদাত, তোমারশ্বশুড় বাড়ী কোথায়? বললাম, মাহমুদ ভাই আমি তো বিয়েই করিনি। তিনি সঙ্গেসঙ্গে বললেন, ধূর মিয়া, তুমি তাহলে কবিতার স্বাদ কী বুঝবে? হা হা হা। বলেতিনি আবৃত্তি করলেন :তোমার হাতে ইচ্ছে করে খাওয়ার/ কুরুলিয়ার পুরনো কৈভাজা/ কাউয়ার মতো মুনশী বাড়ী দাওয়ায়/ দেখবো বসে তোমার ঘষামাজা/ বলবে নাকি, এসেছে কোন গাঁওয়ার?/ ভাঙলে পিঠে কালো চুলের ঢেউ/ আমার মতো বুঝেনি আর কেউ/তবুও যে হাত নাড়িয়ে দিয়ে হাওয়ায়/ শহরে পথ দেখিয়ে দিলে যাওয়ার।

আরেকদিন লিখতে লিখতে তিনি হঠাৎ আমাকে বললেন, আচ্ছা তুমি এডলফ হিটলারেরমাইনকাম্ফ পড়েছো। বললাম, অনেকদিন আগে বইটা হাতে এসেছিল। এখন তো মনে নেই।তিনি বললেন, বইটার ব্যাপারে আমার প্রবল আগ্রহ আছে। পরদিন বইটি আমি ওনাকেদিলাম। উপন্যাস লেখার ফাঁকে ফাঁকে তিনি বইটি পড়ে শোনানোর জন্য আমাকে অনুরোধকরলেন। আমি প্রায় দিনই বইটার কয়েক পৃষ্ঠা করে পড়তাম। এভাবে একসময় বইটাপ্রায় শেষ হয়ে গেলো। তিনি বললেন, হিটলার বলেছেন লিখে টিখে কিছু হয় না, জগতের যত বিপ্লব আর পরিবর্তন এসেছে তার সবই বক্তৃতার মাধ্যমেই হয়েছে। আলমাহমুদ আরও যোগ করলেন, আমার জীবনে আমি এমন ব্যতিক্রম কথা আর শুনিনি।
৩.
আল মাহমুদ চোখে দেখেন না বললেই চলে। তিনি একদিন তার চোখের বৃত্তান্তশোনালেন। বললেন, পৃথিবীর অনেক বড় বড় শহরে তিনি চোখের চিকিৎসার জন্য গেছেন।একবার প্যারিসে এক নারী চিকিৎসক তার চোখ দেখার পর বলেছিলেন, আমার দাদাকিন্তু বাঙালী ছিলো। এই কথা বলে আল মাহমুদ স্মৃতিচারণ করলেন তার চোখথাকাকালীন পড়াশুনার বিভিন্ন বিষয়ের। পরে তিনি বললেন, চোখ নেই তাতে কি, আমিআমার নিজের ভেতরে অনেক চোখ সৃষ্টি করে নিয়েছি !

http://bdbulletin24.com/news.php?content_id=7421