তরুণ প্রজন্ম ও আল মাহমুদ

সায়ীদ আবুবকরঃ একদিন বিকেলে, একুশে বইমেলার সময়, আল মাহমুদের বাসায় গিয়েছি তাকে মেলায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। তাঁর গুলশানের কেয়ারিসান বাসার ড্রয়িংরুমে বসে আছি। আমার সাথে আরো দু’জন তরুণ কবি। কবি ভেতর থেকে বের হয়ে আসার অপেক্ষায় আছি আমরা। কিন্তু তিনি এলেন লুঙ্গি পরে। আমি বললাম, ‘আপনার তো আজকে মেলায় যাওয়ার কথা’। তিনি হাসতে হাসতে আমার পাশে এসে বসে পড়লেন। বললেন, ‘হ্যাঁ, যাবো। এত তাড়াহুড়োর কী আছে। এসেছো, একটু বসো, দু’য়েকটা কথাবার্তা বলি। ওখানে কী কথা বলার এরকম নিরিবিলি পরিবেশ পাওয়া যাবে?’ বলে তিনি একটা সিগারেট ধরালেন। একটা মেয়ে এসে নাস্তা ও চা-পানি দিয়ে গেল। আমি ‘কী দরকার ছিলো’ বলতেই তিনি বললেন, ‘তুমি ঝিনেদা থেকে এসেছো। সামান্য একটু নাস্তা; খাও না।’
তিনি সিগারেট ফুঁকছেন আর কথা বলছেন। ‘চোখ দেখাতে আমি ইন্ডিয়ায় গিয়েছিলাম। তোমাদের বেনাপোল হয়েই গিয়েছিলাম। ইন্ডিয়াতে ঝিনেদার এক মেয়ের সাথে আমার পরিচয় হয়। আমি তাকে তোমার কথা বলি। বলি যে, ঝিনেদাতে একজন কবি আছে সায়ীদ আবুবকর, আমার খুবই ঘনিষ্ঠ, তুমি তাকে চেনো? কিন্তু সে তোমাকে চিনতে পারলো না।’

এর মধ্যে আমরা নাস্তাপর্ব সেরে ফেলেছি। আল মাহমুদ গা এলিয়ে দিয়ে কথা বলে চলেছেন। তিনি বললেন, ‘তুমি যেখানটায় বসে আছো, দুই দিন আগে এখানে এসে বসে ছিলো জয় গোস্বামী। সে এসে তো প্রথমে আমার পদধুলি নিলো। সে বললো, ‘আমি বাংলাদেশে এসেই সর্বপ্রথম আপনার বাসায় আসতে চেয়েছি। কয়েকজনের কাছে আপনার বাসার ঠিকানা চেয়েছি। তারা আমাকে ঠিকানাটা দিতে চায়নি। কিন্তু আমি জানি আপনার সঙ্গে দেখা করাই আমার বাংলাদেশ সফরের প্রধান লক্ষ্য। বিশ্বাস করুন, আপনার সোনালী কাবিন একটি অসাধারণ কাব্যগ্রন্থ। এ রকম কাব্যগ্রন্থ দুই বাংলায় আর কারো নেই বলে আমার বিশ্বাস। আমি আপনার একজন একনিষ্ঠ পাঠক।’ আমি তাকে বললাম, ‘দ্যাখো, আমিও তোমার কবিতা সম্পর্কে অল্পস্বল্প খোঁজ-খবর রাখি। তোমার কবিতাও আমার ভালো লাগে। বিশেষ করে তোমার দীর্ঘ কবিতা লেখার বিষয়টিকে আমি স্বাগত জানাই।’ আমার কথা শুনে তো জয় গোস্বামী হতবাক। সে বললো, ‘আপনি আমার কবিতা পড়েন? যেন ওর বিশ্বাসই হচ্ছিল না। আমি বললাম, ‘দ্যাখো, আমি তরুণদের কবিতাও পড়ি। শুধু পড়ি না, তাদের কবিতার উপর আমি বেশ কয়েকটা প্রবন্ধও লিখেছি।’

০২.
কবিরা সাধারণত কবিদের প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে থাকে। বিশেষ করে জীবিত কবিরা তো পরস্পরকে সহ্য করতে পারে না একদম। তবে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, আল মাহমুদ যত বেশি আক্রান্ত হয়েছেন তার সমবয়সী কবিদের দ্বারা, ততোধিক শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় সিক্ত হয়েছেন তার পরবর্তী প্রজন্মের তরুণ কবিদের দ্বারা। আল মাহমুদের কবিতার ভক্ত কেবল কবিতার সাধারণ পাঠকেরাই নয়, ভক্ত তরুণ প্রজন্মের কবিরাও। সত্য যে, তার কবিতার অন্তর্নিহিত শক্তি ও সৌন্দর্যই তার দিকে পাঠককে টেনেছে বেশি, তবে নতুন প্রজন্মের কবিদের মাঝে তার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির অন্য কোনো কারণ যদি থেকে থাকে, তাহলো তরুণ কবিদের প্রতি তার বিশেষ আগ্রহ ও তাদের সঙ্গে গড়ে ওঠা তার হার্দিক সম্পর্ক।

তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের কবিদের সানন্দে স্বীকৃতি দিতে তিনি কখনও কার্পণ্য করেননি। মিডিয়ার সামনে আসা পোশাকসর্বস্ব কবিদের তিনি অবশ্য পাঁচ পয়সা মূল্য দেননি কখনও। পরিবর্তে আড়ালে আবডালে থাকা প্রচারবিমুখ প্রকৃত কবিদের নিয়ে সুদীর্ঘ প্রবন্ধ লিখে এবং বহুল প্রচারিত জাতীয় পত্রিকাসমূহে তা ছাপিয়ে দিয়ে সারাদেশে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইয়ে দিয়েছেন তিনি নিজস্ব স্টাইলে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত তাঁর বহুল আলোচিত প্রবন্ধ ‘নববইয়ের কবিতা : গোধূলি সন্ধির নৃত্য’র কথা। তিনি বৃদ্ধ বয়সেও অনেক কায়ক্লেশ স্বীকার করে নববইয়ের দশকের কয়েকশ’ কবির কবিতা পাঠ করে তাঁদের মধ্য থেকে মৌলিক কবিদের খুঁজে বের করে তাদের কবিতার উদ্ধৃতিসহ যে মূল্যবান লেখা উপহার দিয়েছেন কবিতা অন্তর।
পাঠকদেরকে, তা সত্যিই এক বিস্ময়কর ব্যাপার।

০৩.
মূলত হৃদয়ের দ্বার উন্মুক্ত রাখার কারণে সব মতাদর্শের তরুণ কবি সাহিত্যিক তাঁর সান্নিধ্যে আসতে পেরেছে খুব সহজে। ঘাদানিক আমলের একটি ঘটনার কথা বলি। তখনকার বহুল প্রচারিত একটি জাতীয় দৈনিকের সাহিত্য সম্পাদক, যিনি নিজেও সত্তরের দশকের একজন বিশিষ্ট কবি এবং আল মাহমুদের একজন একনিষ্ঠ ভক্ত, আল মাহমুদের কবিতা ছাপতে চান তাঁর সাহিত্য পাতায় কিন্তু পত্রিকার টোটাল আবহ আল মাহমুদের প্রতিকূলে। কিন্তু তিনি ঝুঁকি নিয়ে একটি ঈদসংখ্যায় আল মাহমুদের তরতাজা একটি অসাধারণ কবিতা ছেপে দিলেন শামসুর রাহমানের কবিতার নিচে। বয়েসে আল মাহমুদ শামসুর রাহমানের ছোট, ফলে নিচে তিনি ছাপতেই পারেন। কিন্তু উল্টো শামসুর রাহমান গেলেন ক্ষেপে। তিনি ফোন করে সাহিত্যসম্পাদককে শাসিয়ে দিলেন এই বলে, ‘আমার কবিতার নিচে আল মাহমুদের কবিতা ছাপলে আমি তো আর লিখবো না তোমাদের কাগজে।’ সাহিত্যসম্পাদক আল মাহমুদকে বিষয়টা জানালেন। তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে, ওনার কবিতার নিচে যদি না ছাপতে দেয় তাহলে এক কাজ করো, ওনার কবিতা ছাপো প্রথম পাতায়, শেষ পাতায় অন্যদের সঙ্গে ছাপো আমার কবিতা। তবু ছাপো; আমি চাই একই কাগজে পাঠক আমাদের দু’জনকে পড়ুক ও মূল্যায়ন করুক।’ পরবর্তী বিশেষ সংখ্যায় প্রথম পাতায় ফলাও করে ছাপা হলো শামসুর রাহমানের কবিতা এবং শেষ পৃষ্ঠায় সাদামাটাভাবে ছাপা হলো আল মাহমুদের কবিতা। কিন্তু শামসুর রাহমান তাও সহ্য করতে পারলেন না। তিনি সম্পাদককে ফোন করে আল মাহমুদের কবিতা যাতে এ কাগজে আর কখনও ছাপা না হয় সে ব্যবস্থা করে দিলেন। আল মাহমুদ আমাকে এ গল্প শুনিয়েছেন তাঁর বাসাতে বসে। পত্রিকা ভিন্ন মতাদর্শের, মালিকও ভিন্ন মতাদর্শের কিন্তু সাহিত্যসম্পাদক আল মাহমুদের ফ্যান। এরকম ঘটনা কেবল বাংলাদেশে ঘটেনি, পশ্চিমবঙ্গেও ঘটেছে, বহির্বিশ্বেও ঘটেছে।

০৪.
আমিও উঠে এসেছি এক অজপাড়াগাঁ থেকে। সারাজীবন ডাকেই লেখা পাঠিয়ে এসেছি পত্র-পত্রিকায়। সম্পাদক লেখা ছেপেছেন, এর লেখককে দেখতে পাননি কখনও। আমার কবিতা কারো কারো ভালো লাগে, বিভিন্ন মুখে শুনতাম। কিন্তু আল মাহমুদের মতো কবিও আমার কবিতার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠতে পারেন, এ আমি স্বপ্নেও ভাবিনি কখনও। ২০০৬ সালের ১৭ নবেম্বরে প্রকাশিত আমার দেশ-এর একটি সংখ্যায় আমাকে নিয়েই একটি লেখা লিখে ফেললেন তিনি। আমি এসবের কিছুই জানি না। আমি তখন বেনাপোল সীমান্তে। চিকিৎসার জন্য মাকে নিয়ে যাচ্ছি ইন্ডিয়ায়। আমাকে ফোন করে খবরটি জানালেন সাজ্জাদ বিপ্লব। আমি বেনাপোল থেকে সেদিনের এক কপি আমার দেশ কিনে নিলাম। পড়ে তো আমি হতবাক। তিনি যে এক জায়গায় লিখেছেন ‘আমি সায়ীদ আবুবকরের কবিতার পঙক্তিমালা পড়ে প্রথম দিকে স্তম্ভিত হয়ে থাকতাম’, তা আমাকেই স্তম্ভিত করে দিলো একেবারে। একজন তরুণ কবির ওপর এ ধরনের উদার মন্তব্য করা একজন মহান কবির পক্ষেই বোধ হয় কেবল সম্ভব।

০৫.
নবীনরা প্রবীণদের ওপর কাজ করবে, এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু আল মাহমুদ এসবের তোয়াক্কা না করে লেখালেখি করেছেন আমাদের মতো তরুণদের কবিতার ওপরও। তরুণরা যে আজ প্রচুর তাঁর সাহিত্য নিয়ে গবেষণা, পিএইচডি, এমফিল প্রভৃতি করছে এর পেছনে তাঁর তরুণদের মন জয় করে নেয়ার বিষয়টি অবশ্যই কাজ করেছে।

http://www.theanuranan.com/news_detail.php?news_id=4121