আল মাহমুদের কবিতায় উপমার ব্যবহার

সাগর জামান
আর মাহমুদ পঞ্চাশ দশকের প্রধান কবি। এ দশকে যে সব কবি উপমার নিপুণ ব্যবহারে কবিতার গুণগত মান বৃদ্ধি করেছেন, তাদের মধ্যে আল মাহুমদ অন্যতম। আল মাহমুদের কবিতা বিদ্রোহের আগুনে তেজদীপ্ত না হলেও কোমলতায় উজ্জ্বল। তার কবিতায় উপমার পাশাপাশি নিজস্ব প্রকাশভঙ্গি, শব্দ নির্বাচন ও যোজনা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। জীবনানন্দ দাশ প্রথা উপেক্ষা করে উপমা প্রধান কবিতা রচনায় বিশিষ্টতা অর্জন করেন। ‘উপমাই কাব্য’ এ কথাটা স্বতঃসিদ্ধ। উপমা কবিতায় দৃশ্যপট তৈরি করে কবিতাকে প্রাণবন্ত করে তোলে। আল মাহমুদ কবিতাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন উপমার মাধ্যমে।
কবিতাতো কৈশোরের স্মৃতি সে /তো ভেসে ওঠা ম্লান আমার মায়ের মুখ /নিম ডালে বসে থাকা হলুদ পাখিটি /পাতার আগুন ঘিরে রাত জাগা ছোট ভাই বোন। আব্বার ফিরে আসা সাইকেলের ঘন্টাধ্বনি /রাবেয়া রাবেয়া …….. আমার মায়ের নামে খুলে যাওয়া দক্ষিণের ভেজানো কপাট।
উপমার শীতলতা, শব্দের প্রয়োগ কৌশল, স্নিগ্ধ অপরূপা ভোরের মতো অনাবিল বাণীতে আল মাহমুদের কবিতা দীপ্তিময়। তার কবিতায় খন্ড খন্ড ছবি দুলে ওঠে। কুয়াশায় ঢাকা পথ, ভোরের বাঁশ ঝাড়ে ঘাসে ঢাকা দাদার কবর। কিংবা মক্তবের মেয়ে চুল খোলা আয়েশা আক্তার। এ ধরনের নানা ছবি আল মাহমুদের কবিতায় রূপায়িত হয়। তার উপমার বর্ণিল ভুবন থেকে তিনি নানা রঙের নানা অর্থের উপমা তুলে আনেন তার কবিতায়।
পঞ্চাশ দশকের এই বিরল কবি প্রতিভা আল মাহমুদ ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ : কালের কলস, সোনালী কাবিন, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠে, আরব্য রজনীর রাজহাঁস, আল মাহমুদের কবিতা,  পানকৌড়ির রক্ত, যেভাবে বেড়ে উঠি প্রভৃতি। কাহিনী প্রধান কবিতা রচনার ক্ষেত্রেও আল মাহমুদ অনন্য। তার  কাহিনী প্রধান রচনা পাঠক মহলে আদৃত হয়েছে। উপমা সাজে নিজস্ব শব্দপুঞ্জ থেকে সযতেœ তুলে আনা শব্দ দিয়ে মিঠেল রোদের কোমল আভা ছড়িয়ে আল মাহমুদ কবিতা রচনা করেন। তার সব ধরনের কবিতায় এসব অনুষঙ্গ থাকে। আল মাহমুদের কাহিনী প্রধান কবিতা “প্রত্যাবর্তনের লজ্জা” একটি অনবদ্য রচনা।
শেষ ট্রেন ধরবো বলে এক রকম ছুটতে ছুটতে স্টেশনে পৌছে দেখি নীল বর্ণ আলোর সংকেত হতাশার হুইসেল দিয়ে  গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে।
যাদের সাথে শহরে যাবার কথা ছিল তাদের উৎকণ্ঠিত মুখ জানালায় উবুড় হয়ে আমাকে দেখছে হাত নেড়ে সান্ত্বনা দিচ্ছে। ।।
এভাবে এ কাহিনীর সূত্রপাত। পরে সে যুবকের ফিরে যাওয়া। গত রাতে যুবকের বাবা-মার সাথে কথোপকথন ফিরে যাওয়ার দৃশ্যাবলী, মায়ের মমতামাখা উচ্চারণ এবং মাকে জড়িয়ে ‘প্রত্যাবর্তনের লজ্জা’ ঘষে ঘষে তুলে ফেলার আকাঙ্খা এ কবিতায় চিত্রিত হয়েছে।
আল মাহমুদ প্রচলিত নিয়মের গণ্ডি অতিক্রম করে নতুন দিগন্তের পথে হেঁটে যান। তার পরিসর নতুন ভাবনায় বিস্তৃত হয়। তার কবিতার জগৎ  আরো বেশি দ্যুতিময়, আরো বেশি শব্দ শিল্পে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। তিনি উপমার সফলতায় ও বিষয় বৈচিত্র্যে তার ভুবনকে ব্যাতিক্রমী এবং বর্ণাঢ্য করে তোলেন।
আল মাহমুদের কবিতায় উপমার কারণে যেমন কাহিনী কিংবা বক্তব্যের দৃশ্যায়ন তৈরি হয় স্পষ্টভাবে, তেমনি তার অনেক কবিতায় উপমার নানামুখী ব্যবহারে কাহিনী চিত্র বিমূর্ত থাকে। এভাবে আল মাহমুদের কবিতার নানা দিক সৌন্দর্যে তার পরিমন্ডল আলোময় হয়ে ওঠে।
তার কবিতা তাত্ত্বিক উপস্থাপন শিল্প শব্দ শৈলীতে নান্দনিকতা পায়। নিসর্গ প্রেম ব্যাক্তিগত অনুভব, স্বপ্নের ভেলায় ভেসে যাওয়া প্রভৃতি বিষয় তার কবিতায় নানাভাবে উঠে আসে। প্রকট হতাশা এবং অপ্রাপ্তির বেদনার মধ্যেও তার কবিতা ভালবাসার বাণীতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
সোনার দিনার নেই দেনমোহর চেয়ো না হরিণী /যদি চাও দিতে পারি কাবিনহীন হাত দু’টি/ আত্ম বিক্রয়ের স্বর্ণ কোনকালে সঞ্চয় করিনি। আহত বিক্ষত করে চারিদিকে চতুর ভ্রুকুটি ভালবাসা দাও/ যদি আমি দেব আমার চুম্বন।
আল মাহমুদ হতাশা, বেদনা এবং ভালবাসা এই তিন শব্দকে অন্তরঙ্গ প্রতিবেশী করে তোলেন। বহুমাত্রিক দক্ষতায় তিন শব্দকে অন্তরঙ্গ প্রতিবেশী করে তোলেন। বহুমাত্রিক দক্ষতায় তিনি কবিতা রচনা করেন। তার উপমার ব্যবহার শব্দ চয়ন এবং অন্যান্য উপাদানের প্রয়োগ কৌশল তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে। লেখালেখির  অমিত দক্ষতায় শক্তিধর লেখক আল মাহমুদ দীর্ঘজীবন লাভ করুক।

http://www.saveourenvironment.ca/issue13/thirteenth_sagorzaman.htm